নিজস্ব প্রতিবেদক:মোঃ মনির হোসেন
"ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল"— এই প্রবাদটি কেবল লোকগাথা নয়, বরং পলিগঠিত এই জনপদের হাজার বছরের ইতিহাস ও সমৃদ্ধির স্মারক। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে ৫৫ বছরে পদার্পণ করলেও দেশের প্রধান এই শস্যভাণ্ডার আজও আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত। উর্বর কৃষিজমি আর জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদ-নদী এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা হলেও, সঠিক নীতিমালার অভাবে দক্ষিণাঞ্চল আজ দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। নতুন সরকারের কাছে এখন কোটি মানুষের প্রত্যাশা—কয়েক যুগের বঞ্চনা কাটিয়ে এক সময়ের 'প্রাচ্যের ভেনিস' খ্যাত বরিশালকে উন্নয়নের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা।
কৃষি ও ঐতিহ্যের করুণ দশা
বরিশাল বিভাগ বছরে প্রায় ১২ লাখ টন উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করে জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। অথচ এই কৃষিপ্রধান অঞ্চলে আজও কোনো বিশেষায়িত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়নি। আধুনিক হিমাগার ও কৃষিভিত্তিক শিল্প না থাকায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বরিশালের কৃষি ঐতিহ্য রক্ষা ও গবেষণার জন্য অবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।
চিকিৎসার হাহাকার: ধুঁকছে শেরেবাংলা মেডিক্যাল
কৃষি ঐতিহ্যের পরেই এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংকট স্বাস্থ্যখাতে। পুরো দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের শেষ ভরসাস্থল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম)। কিন্তু বর্তমানে প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জামের অভাব, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট এবং ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগীর চাপে হাসপাতালটি নিজেই ‘রোগাক্রান্ত’। সাধারণ রোগের বাইরে জটিল চিকিৎসার জন্য রোগীদের ঢাকা অভিমুখী হতে হয়, যা অনেক সময় দরিদ্র পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, বরিশালে একটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২৫০-এ উন্নীত করে সেবার মান নিশ্চিত করা।
মৃত্যুফাঁদ মহাসড়ক ও রেললাইনের দীর্ঘ প্রতীক্ষা
যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা বরিশালবাসীর জন্য এক নিত্য অভিশাপ। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক এখন এক আতঙ্কের নাম। সরু রাস্তা আর অত্যধিক যানবাহনের চাপে এই পথে প্রতিনিয়ত তাজা প্রাণ ঝরছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ঢাকা-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ অবিলম্বে শুরু করা এখন অপরিহার্য। পাশাপাশি স্বাধীনতার ৫ দশকের বেশি সময় পার হলেও বরিশালের মাটিতে আজও ট্রেনের চাকা ঘোরেনি। বরিশালকে ডুয়েল গেজ রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
ভোলার গ্যাস ও ভোলা-বরিশাল সেতুর প্রত্যাশা
বরিশাল ও ঝালকাঠিতে নামমাত্র বিসিক (BSCIC) শিল্পনগরী থাকলেও অবকাঠামোগত সংকট ও গ্যাসের অভাবে কোনো বড় উদ্যোক্তা গড়ে ওঠেনি। হাতেগোনা যে দু-একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাও এখন হুমকির মুখে। অথচ পাশের জেলা ভোলায় প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি বরিশালে সংযোগ দিয়ে এখানকার বাসাবাড়ি ও কল-কারখানায় গ্যাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একইসাথে ভোলা ও বরিশালের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের জন্য অতি দ্রুত 'ভোলা-বরিশাল সেতু' নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। এই দুই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এবং বরিশালে একটি ইপিজেড (EPZ) স্থাপন করা হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
পর্যটন ও অবকাঠামো উন্নয়ন
সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটাকে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা এখনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। এজন্য বরিশাল ও কুয়াকাটা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন এবং বরিশাল বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা জরুরি। এছাড়া বরিশাল-ঢাকা এবং যশোর-বরিশাল-চট্টগ্রাম আকাশপথে নিয়মিত ফ্লাইট এবং বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলীয় নৌপথে স্টিমার সার্ভিস পুনর্বহাল করা প্রয়োজন।
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং বিশিষ্টজনদের মতে, শস্যভাণ্ডারের এই জনপদকে অবহেলা না করে এর অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি। দক্ষিণাঞ্চল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভায় শক্তিশালী নেতৃত্বের মাধ্যমে এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে বরিশালবাসী।