
মেহেন্দিগঞ্জ প্রতিনিধি :
সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বরিশাল বিভাগের মেঘনা ও সংলগ্ন নদীগুলোতে থামছে না মা ইলিশ শিকার। নদীজুড়ে চলছে অবাধে মাছ ধরার মহোৎসব। স্থানীয় প্রজনন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির স্থানীয় একাধিক নেতার বিরুদ্ধে। সশস্ত্র জেলেদের নিয়মিত হামলায় পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে জেলা মৎস্য দপ্তর, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড। এতে প্রজনন মৌসুমের শুরুতেই মা ইলিশ রক্ষায় চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
বরিশাল জেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা যায়, মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়া থেকে হিজলার পুরো অংশ পর্যন্ত মেঘনা নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের প্রজননের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গভীর ও মিষ্টি পানির এই অঞ্চলে কোনো চর না থাকায় প্রজনন মৌসুমে সমুদ্র থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ডিম ছাড়তে আসে। গত বছরের কঠোর তদারকির ফলে এ বছর নদীতে ইলিশের সংখ্যা ও আকার দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এ বছর সংঘবদ্ধ জেলেদের দাপটে মা ইলিশ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। হিজলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা কেএম মাহফুজুর রহমান জানান, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্তমানে নদীতে দুই থেকে তিনগুণ বেশি জাল ফেলা হচ্ছে। মৎস্য বিভাগ অভিযানে গেলে সশস্ত্র অবস্থায় ১০ থেকে ১২টি দলবদ্ধ নৌকা হামলা চালায়। প্রতিদিন জেলেদের আগ্রাসী আচরণের সামনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয় অধিবাসী ও ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, মেহেন্দিগঞ্জ ও হিজলা এলাকার মেঘনা নদী এখন পুরোপুরি প্রশাসনমুক্ত এবং অবৈধ শিকারিদের দখলে। অভিযোগ উঠেছে, হিজলা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরি এবং সদস্য সচিব দেওয়ান মনির হোসেনের নিয়ন্ত্রণে চলছে পুরো মাছ শিকার ও বেচাকেনার সিন্ডিকেট।
তারা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন কোন জেলেরা কখন এবং কোথায় মাছ শিকার করবেন। স্থানীয় বাজার ও ঘাটে বিক্রি হওয়া ইলিশের ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, নদীর প্রতিটি জালের ওপর প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে ২ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।নদীর বিভিন্ন স্পট ও ঘাটগুলো পৃথক বিএনপি নেতাকর্মী ও তাদের সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে চলছে:আবুপুর লঞ্চ ঘাট: বিএনপি নেতা খালিদ মাঝিটুমচর নদীর তীর (বেবাজিয়া পাড়া): খালিদ মাঝির ছেলে রিফাত, হান্নান ও আরিফ
অন্যান্য পয়েন্ট (কাঁকুড়িয়া, ধুলখোলা খেয়াঘাট, মাঝেরচর): ইসমাইল শেখ, ফারুক সরকার, মোস্তফা শিকদার, আলাম শরীফ, দলু মোল্লা, খোকা বেপারী, আব্দুল কুদ্দুস লিটন, মিজান মাঝি ও মিঠন চৌধুরী।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে হিজলা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব দেওয়ান মনির হোসেন বলেন, “আমরা সরকারের পক্ষে রয়েছি। প্রশাসনের কাজে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং অবৈধ মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নদীতে প্রতিদিন অভিযানের ওপর হামলা চালাচ্ছে সংঘবদ্ধ জেলেরা। আত্মরক্ষার্থে এবং জেলেদের নিবৃত্ত করতে কোস্টগার্ডকে এ পর্যন্ত ১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালাতে হয়েছে। হামলায় হিজলা মৎস্য দপ্তরের স্পিডবোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।হিজলা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াছিনুল হক জানান, বিশাল মেঘনা নদীর তুলনায় নৌ-পুলিশের লোকবল অত্যন্ত সীমিত। রাতের বেলা প্রাণহানির ঝুঁকি থাকায় সব সময় বড় ধরনের অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইলিয়াস সিকদার জানান, অভিযুক্ত প্রভাবশালী নেতাদের ডেকে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ফাঁকা সময়ের সুযোগে যেন মাছ শিকার না হয় সে চেষ্টা চলছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান পরিস্থিতি মূল্যায়নে বলেন, “মেঘনার এই গুরুত্বপুর্ণ ৬০ কিলোমিটার এলাকায় যদি নৌ-বাহিনীর একটি শক্ত ঘাঁটি বা স্থায়ী জাহাজ মোতায়েন করা যেত, তবেই এটি কার্যকরভাবে বন্ধ করা সম্ভব হতো। অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে সব কথা বলাও সম্ভব হচ্ছে না।মোট নিবন্ধিত জেলে (বরিশাল জেলায়।৫,২৯৫ জন।১,৯৯৭.২৫০ মেট্রিক টন ইতোমধ্যে ১০৮৪.৭০০ মেট্রিক টন বিতরণ করা হয়েছে।
২৫ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড।
৫১.১০ লাখ টাকা জরিমানা আদায়।
১৬.২৬৩ লাখ মিটার জাল জব্দ।
০.২৫০ মেট্রিক টন মা ইলিশ উদ্ধার।
প্রবীণ জেলেদের মতে, দুই উপজেলা মেহেন্দিগঞ্জ ও হিজলায় প্রায় ৫০ হাজার জেলে বর্তমানে নদীতে অবস্থান করছেন। পর্যাপ্ত ও স্থায়ী কঠোর নিরাপত্তা না দেওয়া গেলে সরকারি নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, যা ভবিষ্যতের ইলিশ সম্পদের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।